চোখের পানিতে শেষ হলো লিওনেল মেসির ফিফা বিশ্বকাপ যাত্রা। গত জুনে মেসি ৩৯ বছরে পা দিয়েছেন। ২০৩০ সালে পরবর্তী বিশ্বকাপ যখন আসবে, তখন আর্জেন্টাইন মহাতারকার বয়স হবে ৪৩ বছর। একজন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের জন্য এই বয়সে বিশ্বমঞ্চে খেলাটা প্রায় অসম্ভব।
রোববার রাতের ফাইনালের আগ পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, কাতারে প্রথম শিরোপা জেতার চার বছর পর মেসি হয়তো দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ মুকুট মাথায় তুলবেন। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে নিয়ে লিখে রেখেছিল অন্যকিছু।
ফাইনালের আগে মেসি স্বপ্নের মতো সময় পার করছিলেন। বিশ্বকাপে নিজের মোট গোল সংখ্যা নিয়ে গিয়েছিলেন ২১-এ। তবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোল করে কিলিয়ান এমবাপে ছাড়িয়ে গেলেন তাঁকে। রেকর্ড ২২ গোল নিয়ে ফ্রান্স ফরোয়ার্ডই সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড এককভাবে বহন করছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে টেনে তুলেছিলেন মেসি। কেবল এমবাপেই (১০ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট) তাঁর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। ফাইনালে দুটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করতে পারলে মেসি গোল্ডেন বুটও জিতে নিতে পারতেন। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি।
গোল্ডেন বলের অন্যতম দাবিদার মেসি
তবুও যে কেউ মনে করতেই পারে যে মেসিই গোল্ডেন বল পাওয়ার যোগ্য দাবিদার। তাঁর ভক্তরা আশায় ছিলেন যে, ২০১৪ ও ২০২২ সালের পর মেসি এবার রেকর্ড গড়ে তৃতীয়বারের মতো গোল্ডেন বল জিতবেন।
টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা যখনই বিপদে পড়েছে, মেসি তখনই দলের ত্রাণকর্তা হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। কেবল কঠিন সময়ে গোল করাই নয়, ডান প্রান্তে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল গোলের সুবাস। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমি-ফাইনালেও আর্জেন্টিনা ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল। এরপর মাত্র ৭ মিনিটের ব্যবধানে মেসির দুটি দুর্দান্ত অ্যাসিস্ট থেকে গোল করেন এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ।
অথচ, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতে নিলেন স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি। ২০২৫ সালের মে মাসে হাঁটুর অস্ত্রোপচার কারণে আট মাস পর ফিরে ম্যানচেস্টার সিটির এই মিডফিল্ডার স্পেনকে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন।
পুরস্কার জেতার পর রদ্রি বলেন, ‘আমার জন্য সময়টা খুব কঠিন ছিল। আমি শুধু নতুন প্রজন্মকে দেখাতে চাই যে, আপনি যদি পড়েও যান, তবে আবারও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। এটাই আমার জীবনের দর্শন। সব সময় সবকিছু ভালো যাবে না, কখনও খারাপও হবে। তবে সব সময় ইতিবাচক থাকতে হবে।’
কেন রদ্রি গোল্ডেন বল জিতলেন?
পুরো টুর্নামেন্টে রদ্রির কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট ছিল না। কিন্তু স্পেনের পজেশন-ভিত্তিক (বল দখলে রাখার) খেলার স্টাইলে তিনি ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ৭৫৩টি পাস সম্পন্ন করেছেন তিনি, যার নিখুঁততার হার ছিল ৯৪%। ফিফার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তিনি ১,৮০৩টি প্লে-তে জড়িত ছিলেন, যা এই বিশ্বকাপের অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে প্রায় ২০০টি বেশি।
ফিফা তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘এই মিডফিল্ডার লা রোজাদের আটটি ম্যাচেই মাঝমাঠে এক অবিচল ভরসা হয়ে ছিলেন এবং দলকে দ্বিতীয়বারের মতো বৈশ্বিক মুকুট জেতাতে সাহায্য করেছেন।’ রক্ষণভাগের সঙ্গে আক্রমণভাগের সংযোগ তৈরি করাতে তিনি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানের ফাইনাল জয়টিতে।’
ফিফা আরও যোগ করে, ‘ফাইনাল ম্যাচে ৩০ বছর বয়সী এই তারকা ১০৫টি পাসের মধ্যে ১০১টি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করেন। ৮০ শতাংশ ডুয়েল জেতেন এবং দুটি গোলের সুযোগ তৈরি করেন। টুর্নামেন্টজুড়ে ডিফেন্ডারদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত পারফরম্যান্সের কারণেই স্পেন ৮ ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে।’


