স্পেনের শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে রোববার রাতে পর্দা নামল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের আয়োজন দেখল ফুটবল বিশ্ব। বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে ৬৪ দলের বিশ্বকাপের। কিন্তু এত বড় আয়োজন কি আদৌ সম্ভব হবে?
২০১৬ সালে ফিফা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে যত বেশি নীতিতে এগিয়েছেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। বিশ্বকাপের পরিধি বাড়ানো, নতুন আঙ্গিকে ক্লাব বিশ্বকাপ আয়োজন কিংবা টিকিটের আকাশচুম্বী মূল্য—সবকিছুতেই এর প্রমাণ মেলে। এমনকি জমকালো অনুষ্ঠানের চক্করে ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালের হাফ-টাইম দীর্ঘায়িত হয় ২৭ মিনিট ২২ সেকেন্ড পর্যন্ত।
৬৪ বদলের বিশ্বকাপ নিয়ে ইনফান্তিনো যুক্তি—ছোট দেশগুলোকে যদি অংশ নেওয়ার সুযোগই না দেওয়া হয় তাহলে তাদের নিজেদের উন্নতির কোনো তাড়না থাকবে না।
প্রতিযোগিতার কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলে, ৬৪ দলের এই পরিকল্পনা বেশ গোছানো শোনায়। ১৬টি গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলবে দলগুলো এবং প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল নকআউট পর্বে যাবে। ফলে পয়েন্ট টেবিলের তৃতীয় স্থানে থাকা দলগুলোর মধ্যে থেকে টেনেটুনে কয়েকটিকে পরের রাউন্ডে তোলার যে জটিলতা, তা আর থাকবে না।
কিন্তু টুর্নামেন্ট বড় করার পেছনে এই গাণিতিক সুবিধা ছাড়া আর কোনো যৌক্তিক কারণ কি আসলেই আছে?
এই বিশাল পরিবর্তনের পেছনে কারা?
ইতিহাসটা একটু পেছন থেকে দেখা যাক। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপটি হবে ফুটবল বিশ্বকাপের শতবর্ষ পূর্তি (১০০ বছর)। প্রথম বিশ্বকাপ হয়েছিল উরুগুয়েতে। শতবর্ষী আসরটির মূল আয়োজক মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেন হলেও, উদ্বোধনী তিনটি ম্যাচ হবে দক্ষিণ আমেরিকার তিন দেশ উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে।
দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল কনফেডারেশন (কনমেবল) মূলত আরও বেশি ম্যাচ চায়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তারা একটি বিশেষ এককালীন টুর্নামেন্টের প্রস্তাব দেয়, যেখানে ৬৪টি দল অংশ নেবে।
তবে এই প্রস্তাবে বিশ্বের অন্য কোথাও থেকে তেমন সমর্থন মেলেনি। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থার (ইউয়েফা) সভাপতি আলেকসান্দার সেফেরিন এটিকে টুর্নামেন্ট এবং বাছাইপর্ব—উভয় প্রক্রিয়ার জন্যই বাজে আইডিয়া বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা (কনকাকাফ) প্রধান ভিক্টর মন্টালিয়ানি গত বছর সতর্ক করেছিলেন, এটি ‘ফুটবলের সামগ্রিক পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করবে।’ একই সুর মেলান এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) প্রধান শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খালিফা।
অবশ্য বিরোধিতার মানে পরিকল্পনাটি বাতিল হয়ে যাবে এমন নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি আসবে ফিফা কাউন্সিলের ৩৭ জন সদস্যের ভোটেই।
এই সম্প্রসারণ কি শুধুই টাকার খেলা?
ইনফান্তিনো যখন ফিফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তার অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল ফুটবলে আরও বেশি টাকা নিয়ে আসা। বর্তমানে প্রতিটি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ৪ বছর মেয়াদে ৮০ লাখ ডলার ফান্ড পায়, আর ছোট দেশগুলো পায় আরও অতিরিক্ত ১২ লাখ ডলার। প্রতিটি কনফেডারেশন ফুটবল উন্নয়ন ও প্রসারের জন্য পায় ৬ কোটি ডলার। আর এই কাড়ি কাড়ি টাকার কারণেই আগামী নির্বাচনেও ইনফান্তিনোর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
২০১৭ সালে ফিফা হিসাব করেছিল, ৪৮ দলের বিশ্বকাপ থেকে তাদের আয় হবে ৬.৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালে তারা ফরম্যাট পরিবর্তন করে আরও ২৪টি ম্যাচ বাড়িয়ে দেয় এবং ফলশ্রুতিতে এবার তাদের আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।
খুব স্বাভাবিকভাবেই, ৬৪ দলের টুর্নামেন্ট হলে টিভি স্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং টিকিট বিক্রি থেকে আয় আরও আকাশ ছোঁবে। ফিফার দাবি, ফুটবলের প্রচার ও প্রসার করা তাদের দায়িত্ব এবং এই দায়িত্ব পালনের প্রধান হাতিয়ার আরও বেশি বেশি ফুটবল।
দল বাড়লে কি বিশ্বকাপের মান কমবে?
৬৪ দলের টুর্নামেন্টের প্রধান দুটি ইতিবাচক দিক রয়েছে: প্রথমত, একটি সহজ ও স্বাভাবিক টুর্নামেন্ট ফরম্যাট; দ্বিতীয়ত, উদীয়মান দেশগুলোর জন্য বড় মঞ্চে আসার সুযোগ।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিয়েছিল। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফিফাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল, অতিরিক্ত যুক্ত হওয়া দলগুলো খুব একটা ভালো করতে পারবে না।
তবে বিশ্বকাপে দারুণ পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে চমক দেখিয়েছে কেপ ভার্দের মতো পুচকে দেশ। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো পরাশক্তিকে রুখে দিয়ে তারা গ্রুপে দ্বিতীয় হয়। শেষ ১৬-র লড়াইয়ে আর্জেন্টিনাকে কাঁপিয়ে দিয়ে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে হারে কেপ ভার্দে।
দল আরও বাড়লে বেলজিয়াম (২০২২), জার্মানি (২০১৮), স্পেন (২০১৪), ইতালি (২০১০) কিংবা ফ্রান্সের (২০০২) মতো শীর্ষ দলগুলোর গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার যে নাটকীয়তা, তা হয়তো আর দেখাই যাবে না।
৬৪ দলের বিশ্বকাপে অতিরিক্ত দল যুক্ত হবে কোথায় থেকে
২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের হিসাব ধরলে, ৬৪ দলের বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া বাড়তি দলগুলো হতো এমন:
এশিয়া: ইন্দোনেশিয়া (১১৮), ওমান (৭৯), সংযুক্ত আরব আমিরাত (৬৮)।
ইউরোপ: ডেনমার্ক (২১), ইতালি (১২), পোল্যান্ড (৩৬)।
কনকাকাফ : হন্ডুরাস (৬৫), জ্যামাইকা (৭১), সুরিনাম (১২৫)।
কনমেবল : বলিভিয়া (৭৭), ভেনিজুয়েলা (৪৯)।
ওশেনিয়া: নিউ ক্যালেডোনিয়া (১৫১)।
আফ্রিকা : বুর্কিনা ফাসো (৬২), ক্যামেরুন (৪৪), গ্যাবন (৮৬), নাইজেরিয়া (২৬)।
এই বাড়তি দলগুলোর মধ্যে মাত্র ৬টি দল ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ৫০-এর মধ্যে আছে। সমস্যাটা এখানেই। এশিয়া এবং কনকাকাফ তুলনামূলক দুর্বল অঞ্চল, যা গত আসরের পারফরম্যান্সেই স্পষ্ট।
আফ্রিকার ১০টি দলের মধ্যে ৯টিই নকআউট পর্বে উঠেছিল। অথচ এশিয়ার ৯টি দলের মধ্যে মাত্র ২টি এবং কনকাকাফের ৬টি দলের মধ্যে মাত্র ৩টি দল (যারা সহ-আয়োজক ছিল) পরের রাউন্ডে যেতে পেরেছিল। ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে নিউ জিল্যান্ড মাত্র ১ পয়েন্ট পেয়ে তলানিতে ছিল, অথচ ওশেনিয়া মহাদেশের মধ্যে ওরাই একমাত্র দল যারা বিশ্বের শীর্ষ ১৫০-এর মধ্যে আছে।
তাই যুক্তি বলে, প্রতিযোগিতার মান ঠিক রাখতে হলে ইউরোপকে আরও বেশি আসন দেওয়া উচিত। কিন্তু বিপরীত যুক্তি হলো, বিশ্বকাপে বেশি সুযোগ পেলেই কেবল ওইসব দেশে ফুটবলের উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু এতে টুর্নামেন্টের আসল সৌন্দর্য বজায় থাকবে কি না—তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই যদি মূল পর্বে খেলে, তবে গ্রুপ পর্বটা কি কেবলই নকআউট পর্বের টিকিট পাওয়ার আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেবে না?
৬৪ দলের আয়োজনের লজিস্টিক জটিলতা
খাতাকলমে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজন করা মানে কেবল বাড়তি ৪টি গ্রুপ জুড়ে দেওয়া। কিন্তু দল বাড়লে টুর্নামেন্টের সময়ও বাড়বে।
২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হতে সময় লেগেছে ৩৯ দিন। আরও ২৪টি ম্যাচ বাড়লে শিডিউলে অতিরিক্ত ২০টি স্লট লাগবে, যার অর্থ টুর্নামেন্ট আরও ৫ দিন দীর্ঘায়িত হবে।
সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপ দুটি বিশেষ কারণে সফল হয়েছিল: একাধিক টাইম জোন এবং ইনডোর স্টেডিয়াম। ইউরোপে সাম্প্রতিক তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে দিনের আলোতে খেলা দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
অন্যান্য আয়োজক দেশের পক্ষে আটলান্টা, ডালাস, হিউস্টন বা ভ্যাঙ্কুভারের মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও ছাদঢাকা স্টেডিয়াম তৈরি করা সহজ নয়। সৌদি আরবের ২০৩৫ সালের বিশ্বকাপটি হয়তো তীব্র গরম এড়াতে জানুয়ারি মাসে সরিয়ে নেওয়া হবে কিন্তু অন্য দেশগুলো এই আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা পরিষ্কার নয়।
বিশ্বকাপে দল বাড়লে অতিরিক্ত স্টেডিয়ামের প্রয়োজন হবে। এশিয়ান বা আফ্রিকান দেশ কীভাবে এই বিশাল খরচের ফান্ড জোগাড় করবে সেটা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপে ১৬টি আয়োজক শহরে ৪৩,০০০ থেকে ৮১,০০০ দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়াম লেগেছিল। দল বাড়লে স্টেডিয়াম আরও বেশি লাগবে।
৬৪টি দলের জন্য ৬৪টি বিশ্বমানের আধুনিক ও এলিট ট্রেনিং সেন্টারের প্রয়োজন হবে। বিশ্বজুড়ে আসা লাখ লাখ ভক্ত-সমর্থকদের থাকার জন্য হোটেল এবং তাদের যাতায়াতের জন্য বিশাল অবকাঠামো ও যাতায়াত ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়বে।
তাই বিশ্বকাপ বড় করা মানে কেবল কয়েকটি দেশকে খেলার সুযোগ দেওয়া নয়, এর পেছনে রয়েছে বিশাল লজিস্টিক ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।
মূল প্রতিবেদন: বিবিসি


