লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন

0
89

চট্টগ্রামে  গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা লোডশেডিংয়ের কারণে অতিষ্ঠ জনজীবন। নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নগরবাসী।স্কুলগুলোতে শুরু হয়েছে অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা। কিন্তু ছেলেমেয়েরা বই নিয়ে বসার কোন সুযোগ নেই। দিনে রাতে একই অবস্থা। বিদ্যুতের কারণে নগরীতে দেখা দিয়েছে পানির সমস্যাও।আগামীকাল সোমবার থেকে শুরু হবে স্কুলের। দীর্ঘ দুই মাসের বেশি বন্ধ থাকার পর  ক্লাস শুরু হলেও কি অবস্থা হবে ছেলে মেয়েদের জানিনা। অভিভাবকরাও এ ব্যাপারে চিন্তিত।অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ সহ বিভিন্ন মেডিকেলে রোগীদের অবস্থা করুন।সেখানে নেই কোন জেনারেটর। সরকারি অফিস আদালতে বিদ্যুৎ না থাকার কারণে অলসভাবে কর্মকর্তারা সময় কাটাচ্ছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আমাদের জনজীবন। এই বিপদের শেষ কখন কেউ জানে না।

শনিবার (৩ জুন) দুপুরের দিকে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা হারুনুর রশীদ বলেন, চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকার কারণে প্রচুর ঘাম হচ্ছে এবং গরমের তীব্রতা বেশি অনুভূত হচ্ছে।

পিজিসিবি’র তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৩ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট। তারপরও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের জন্য চলছে হাহাকার। অনেক গ্রামে দিনে-রাতে ৩-৪ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। আগে রাজধানী ঢাকা কিছুটা হলেও লোডশেডিং মুক্ত ছিল। এখন ঢাকায়ও লোডশেডিং হচ্ছে। রাতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি।   এদিকে কয়লা সংকটে আজ দেশের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে ১২শ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাবে।

দেশব্যাপী বিদ্যুতের এ লোডশেডিংয়ে ফুঁসে উঠেছে মানুষ। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে নানা ট্রল ও স্ট্যাটাস। বিদ্যুৎ গেলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে ওই এলাকার বিদ্যুৎ কোম্পানি। ফেসবুকের ট্রল থেকে রেহাই পাচ্ছেন না বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীসহ বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষকর্তারা। কোনো কোনো গ্রামে পল্লী বিদ্যুৎকেন্দ্রের অফিসে হামলার খবর পাওয়া গেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ করে রেখেছেন মালিকরা। শিল্প মালিকরা বলেছেন, যতবার কারখানা বন্ধ হবে ততবার কাঁচামাল ফেলে দিতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। নতুন করে ফ্যাক্টরি চালু করতে ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগে। এ কারণে অনেকে কারখানা বন্ধ রাখছেন।
জানা যায়, একদিকে তীব্র গরম অপরদিকে লোডশেডিং-এই দুইয়ে মিলে মানুষ ও প্রাণীর প্রাণ ওষ্ঠাগত। শুক্রবার,শনিবার  ছুটির দিনে অনেকেই বাসা-বাড়িতে ছিলেন। যে কারণে কিছুটা ফুরসত ছিল। কিন্তু গরমের এমনই দশা ছিল যে, ফ্যানের নিচেও ঘামতে হয়। পুকুরের পানি আর বাসার ছাদের ট্যাংকির পানি পর্যন্ত গরম ছিল। এমনকি ঘরের খাবার পানি গরম হয়ে যায়। দাবদাহে প্রায় সব বয়সের মানুষেরই নাকাল অবস্থা। তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে বৃদ্ধ ও শিশুরা। খেটে খাওয়া মানুষেরও ত্রাহিদশা। এই গরমে ডায়রিয়া-আমাশয়-জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগের প্রার্দুভাব দেখা দিয়েছে। ঢাকার মহাখালীর আইসিডিডিআর.বিতে বেড়েছে রোগীর চাপ। ঢাকা মেডিকেল, ঢাকা শিশু হাসপাতালেও রোগী ভর্তি বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তীব্র খরতাপ অব্যাহত থাকতে পারে আরও অন্তত এক সপ্তাহ। বৃহস্পতিবারের আগে আকাশে মেঘের আনাগোনার কোনো পূর্বাভাস নেই। ফলে বৃষ্টিশূন্য দিন আরও প্রলম্বিত হবে। সেই সঙ্গে বাড়বে তাপমাত্রা। ফলে গরমের প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে দিনে-রাতে লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হলেও সরকারের হিসাব অনুযায়ী লোডশেডিং হচ্ছে সামান্য। পাওয়ার গ্রিড অব কোম্পানি বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, শুক্রবার দিনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১২৮০০ মেগাওয়াট। এ সময় উৎপাদন দেখানো হয়েছে ১২৩৪৮ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল মাত্র ৪৫১ মেগাওয়াট। অপরদিকে সন্ধ্যায় ১৪৮০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন দেখানো হয় ১৪৩৩৪ মেগাওয়াট। ঘাটতি মাত্র ৪৬৬ মেগাওয়াট। অথচ বেসরকারি হিসাবে সারা দেশে লোডশেডিং আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট। একই অবস্থা পিডিবির ওয়েবসাইটেও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়েবসাইটে গতানুগতিক তথ্য দেয় পিডিবি ও পিজিসিবি। তাদের মতে, পিডিবি যতটুকু উৎপাদন করতে পারছে ততটুকুই চাহিদা দেখায়। প্রকৃত চাহিদা কখনো ওয়েবসাইটে দেয় না।
এদিকে শিল্পমালিকরা জানিয়েছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে দিনের অধিকাংশ সময় কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো বিদেশে পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রপ্তানি অর্ডার বাতিলের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাপমাত্রা না কমা পর্যন্ত ভোগান্তি কমবে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গরম বেড়ে যাওয়ায় এসি ও ফ্যান বেশি চলছে। পাশাপাশি সেচ মৌসুমের পিক আওয়ার চলায় বিদ্যুতের চাহিদা একলাফে অনেক বেড়েছে। উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা বেশি হওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
জানা যায়, গ্রামে অর্থাৎ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাভুক্ত এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট। লোডশেডিংয়ে বেশি নাজুক ৬৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। ঢাকার বাইরে রাতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খুবই খারাপ। গরমে অতিষ্ঠ মানুষ রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। অনেকে গরম সহ্য করতে না পেরে ঘর থেকে বাইরে বের হয়ে যাচ্ছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে সেচ কার্যক্রম। অনেক এলাকায় সেচ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে ধানের ফলনে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। কৃষকরা জানিয়েছেন, এখন সেচ মৌসুমের শেষ দিক। এই সময় ফসলের খেতে পানির খুব প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় পর্যাপ্ত পানি দিতে পারছেন না তারা। এ কারণে ফলনেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গ্যাস ও জ্বালানি তেল সংকটে শুক্রবার ৪ হাজার ১৫৬ মেগাওয়াট এবং কেন্দ্র মেরামত ও সংরক্ষণের জন্য ২ হাজার ৬৪৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়নি। চকবাজারের  বাসিন্দা আজম খান বলেন, ‘গভীর রাতেও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বাচ্চাদের নিয়ে কষ্টে আছি। একদিকে মশা, অন্যদিকে লোডশেডিং-সব মিলিয়ে একটি সংকটে আছি।’
আন্দরকিল্লার বাসিন্দা রাজিব জানান, এক সপ্তাহ ধরে লোডশেডিং বেড়েছে। শুক্রবারও শনিবার দফায় দফায় বিদ্যুৎ গেছে। সামনে বাচ্চাদের পরীক্ষা। এভাবে চললে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।

 গেলো কয়েকমাস আগেও গণমাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের গল্প শুনেছি। সংসদেও দেখেছি বিদ্যুৎ নিয়ে নানান মনগড়া বক্তব্য। কিন্তু কাজের বেলায় শূন্য।  বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রামে বেশ কিছুদিন বিদ্যুতের নাজুক পরিস্থিতি। গ্রাম-গঞ্জের পরিস্থিতি আরো খারাপ।

গরমে শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হওয়ার পাশাপাশি নগরীতে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার চিত্রও একই। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনে যেমন অবস্থা, তেমনি রাতের অবস্থা আরও খারাপ। প্রত্যেক রাতেই প্রথমদিকে, মধ্যভাগে এবং শেষার্ধ্বে বিদ্যুৎ থাকে না উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়।

দুপুরে সূর্যের তাপ বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রাম শহরে লোকজনের আনাগোনাও কমে গেছে। জরুরি কাজ না থাকলে ঘর থেকে বের হচ্ছে না অনেকে।

চট্টগ্রামে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে ১১০০-১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। সেখানে পাওয়া যায় ৮০০ থেকে ৮৫০ মেগাওয়াট।

চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী এম রেজাউল করিম বলেন  বলেন, চট্টগ্রামে খুব গরম পড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই দফায় দফায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। চট্টগ্রামে দৈনিক যে বিদ্যুতের চাহিদা তার চেয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here